রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনী একটি বিশাল বিষয় যা বিস্তারিতভাবে তাঁর শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনা এবং ইসলামের প্রচারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপই ইসলামের বার্তা ও মূল্যবোধের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি ধাপের বিশদ বিবরণ প্রদান করা হলো:
১. শৈশব ও তারুণ্য
জন্ম:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে (ইসলামিক ক্যালেন্ডারের ১২ রবিউল আউয়াল) মক্কায় কুরাইশ বংশের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। তাঁর জন্মের কিছুদিন আগেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। মুহাম্মাদ (সা.) জন্মের পর থেকেই ছিলেন এতিম।
শৈশব:
- ছয় বছর বয়সে তাঁর মা আমিনা ইন্তেকাল করেন।
- এরপর তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁকে লালনপালন করেন, কিন্তু দু'বছর পর তাঁর দাদাও ইন্তেকাল করেন।
- তখন মুহাম্মাদ (সা.)-এর দেখাশোনা করেন তাঁর চাচা আবু তালিব, যিনি তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ ও যত্নে বড় করেন।
তরুণ বয়স:
মুহাম্মাদ (সা.) যুবক বয়স থেকেই সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর সততা এবং নৈতিকতা এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে, মক্কার লোকেরা তাঁকে "আল-আমিন" (বিশ্বাসী) এবং "আস-সাদিক" (সত্যবাদী) নামে ডাকত।
২. নবুয়ত লাভ
প্রথম ওহী (প্রকাশ):
৪০ বছর বয়সে, ৬১০ খ্রিস্টাব্দে, মক্কার কাছাকাছি অবস্থিত হেরা গুহায় ধ্যানরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রথম ওহী (আল্লাহর বাণী) নাজিল হয়। জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে তাঁকে বললেন, "ইকরা" অর্থাৎ "পড়ো"। এভাবেই শুরু হয় আল্লাহর বাণী, যা পরবর্তীতে কুরআনুল কারীম হিসেবে মুসলিমদের নিকট প্রেরিত হয়।
প্রথম অনুসারী:
- প্রথম ওহী পাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.)-ই প্রথম মুসলিম হন। এরপর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর (রা.), চাচাতো ভাই আলী (রা.) এবং গৃহভৃত্য যায়েদ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
- ইসলামের শুরুতে গোপনে প্রচার করা হয়েছিল। তিন বছর পর আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু হয়, কিন্তু কুরাইশদের প্রবল বিরোধিতা ও নির্যাতনের শিকার হন রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর অনুসারীরা।
৩. হিজরত ও মদিনায় জীবন
হিজরত:
- ৬২২ খ্রিস্টাব্দে, মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদের সাথে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনার লোকেরা তাঁকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়, এবং তিনি সেখানে ইসলামের ভিত্তিতে একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই হিজরতের ঘটনাকে ইসলামের ক্যালেন্ডার হিসেবে গণ্য করা হয় (হিজরি সন)।
মদিনার চুক্তি:
মদিনায় তিনি মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মের লোকদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি চুক্তি করেন, যা মদিনা সনদ নামে পরিচিত। এটি ছিল একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারত।
যুদ্ধসমূহ:
মদিনায় বসবাসের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধগুলো ছিল মক্কার কুরাইশদের সাথে, যারা ইসলামের বিস্তারে বাধা দিচ্ছিল। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ হলো:
- **বদরের যুদ্ধ (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ)**: এটি মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়।
- **উহুদের যুদ্ধ (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ)**: এই যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হয়, তবে এই যুদ্ধ মুসলিমদের একতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়।
- **খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭ খ্রিস্টাব্দ)**: এটি ছিল একটি প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ, যেখানে মুসলিমরা কৌশলের মাধ্যমে বিজয় লাভ করে।
ইসলামের প্রসার:
রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতেও ইসলাম প্রচার করেন। তিনি বিভিন্ন রাজা, শাসক এবং জাতির নিকট চিঠি পাঠিয়ে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। এর মধ্যে পারস্য, রোম, ইথিওপিয়া ও মিশরের শাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো উল্লেখযোগ্য।
৪. মক্কা বিজয় ও বিদায় হজ
মক্কা বিজয়:
- ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা বিজয় করেন। মক্কায় প্রবেশের সময় তিনি কোন রক্তপাত না করে শান্তির বার্তা দিয়ে শহরটি দখল করেন। মক্কার কুরাইশদের ক্ষমা করে দিয়ে তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য মোড়।
বিদায় হজ:
- ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর বিদায় হজ সম্পন্ন করেন, যা ছিল ইসলামের মূলনীতি ও মানবাধিকার বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত বার্তা। বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেছিলেন:
- সব মানুষ সমান, জাতি, গোত্র বা বংশের ভিত্তিতে কেউ কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়।
- নারীদের প্রতি সদয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
- সব মুসলিম ভাই ভাই এবং পরস্পরের সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব।
৫. ইন্তেকাল
রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পরে ইসলামের নেতৃত্ব সাহাবিদের ওপর ন্যস্ত হয়, এবং তাঁর শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই ইসলামি সভ্যতা গড়ে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি ঘটনা মুসলিমদের জন্য নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সমাজ গঠনের পথ প্রদর্শন করে। তাঁর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করেই মুসলিম উম্মাহ তাদের জীবন পরিচালনা করে থাকে।
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী
২. ইসলামের নবী
৩. নবুওয়ত লাভ
৪. মক্কা বিজয়
৫. বিদায় হজ
৬. হিজরত
৭. মদিনার সনদ
৮. বদরের যুদ্ধ
৯. ইসলামের প্রসার
১০. নবী মুহাম্মাদ (সা.)
১১. ওহী নাজিল
১২. মুসলিম উম্মাহ
১৩. ইসলামের প্রতিষ্ঠা
১৪. আল-আমিন
১৫. রাসূলের আদর্শ
.jpg)